পাঠকের কণ্ঠ

আপনার এলাকার কৃষি সংবাদ, সাফল্যের গল্প, লেখা, ছবি বা ভিডিও পাঠান। নির্বাচিত কনটেন্ট প্রকাশ করা হবে।

২ লেখা
২ ছবি
২ ভিডিও
২ মোট পাঠকের কণ্ঠ
রাজশাহীর আমের বাম্পার ফলন, রপ্তানি আয় বাড়ানোর সম্ভাবনা
লেখা

রাজশাহীর আমের বাম্পার ফলন, রপ্তানি আয় বাড়ানোর সম্ভাবনা

মো. শাহিন ৫ মাস আগে

রাজশাহী অঞ্চলে এ বছর আমের বাম্পার ফলন হয়েছে। গত বছরের তুলনায় এ বছর প্রায় ৩০% বেশি আম উৎপাদনের আশা করছেন কৃষক ও উদ্যোক্তারা। অনুকূল আবহাওয়া, সময়মতো বৃষ্টিপাত ও গাছের সঠিক পরিচর্যার কারণে এ সাফল্য এসেছে। রাজশাহীর আম এখন দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে।


রাজশাহীর আমের ইতিহাস ও বৈচিত্র্য

রাজশাহী আমের জন্য সারা দেশে বিখ্যাত। এ অঞ্চলের মাটি ও আবহাওয়া আম চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। রাজশাহীতে প্রধানত হিমসাগর, ল্যাংড়া, ফজলি, গোপালভোগ, আম্রপালি ও বাঁশখালী জাতের আম চাষ হয়। হিমসাগর রসালো ও মিষ্টি, জুন মাসের মাঝামাঝি সময়ে পাকে। ল্যাংড়া আঁশহীন ও সুগন্ধিযুক্ত, জুলাই মাসে পাকে। ফজলি আকারে বড়, আচার ও জুস তৈরিতে ব্যবহার হয়, জুলাইয়ে পাকে। গোপালভোগ ছোট আকারের ও মিষ্টি, জুনের শুরুতে পাকে। আম্রপালি একটি হাইব্রিড জাত, জুন-জুলাইয়ে পাকে। বাঁশখালী স্থানীয় জাত, মিষ্টি ও সুগন্ধিযুক্ত।


এ বছরের ফলনের পরিসংখ্যান

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রাজশাহীর তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহীতে মোট আম বাগানের পরিমাণ ৩৫ হাজার হেক্টর। এ বছর আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ৪.৫ লাখ মেট্রিক টন। গত বছরের তুলনায় প্রবৃদ্ধি ২৮%। রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা ৫০ হাজার মেট্রিক টন।


কৃষকদের সফলতার গল্প

রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার কৃষক মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, "আমার ৫ একর জমিতে আম বাগান আছে। এ বছর গাছে গাছে থোকায় থোকায় আম ধরেছে। গতবারের চেয়ে এ বছর প্রায় দ্বিগুণ আম পাব বলে আশা করছি। দামও ভালো পাচ্ছি। সরকারি প্রণোদনা ও কৃষি অফিসের পরামর্শ খুব কাজে দিয়েছে।" চারঘাটের কৃষক মোছা. রহিমা বেগম বলেন, "আমার স্বামী মারা যাওয়ার পর আম বাগান দেখাশোনা করি। এ বছর বাগানে ভালো ফলন হয়েছে। স্থানীয় বাজারে আম বিক্রি করে সংসার চালাচ্ছি। আম বিক্রি করে সঞ্চয় করছি মেয়ের বিয়ের জন্য।"


আম রপ্তানির সম্ভাবনা ও প্রক্রিয়া

রাজশাহীর আম এখন ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে। রপ্তানি করা দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও কুয়েত। রপ্তানির ধাপসমূহ হলো: আম সংগ্রহ, গ্রেডিং, প্যাকেজিং, হরমোন ট্রিটমেন্ট, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গুদামে সংরক্ষণ, কন্টেইনারে লোডিং ও প্রেরণ। প্রতি কেজি রপ্তানি মূল্য ২৫০-৪০০ টাকা, যা দেশের বাজারের তুলনায় ২-৩ গুণ বেশি।


সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ

রাজশাহীতে আম চাষ ও রপ্তানি বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে কৃষকদের বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ ও উন্নত মানের চারা সরবরাহ করা হচ্ছে। কৃষি ব্যাংকের মাধ্যমে সহজ শর্তে কৃষি ঋণ দেওয়া হচ্ছে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গুদাম নির্মাণ করা হয়েছে। হিমসাগর আমের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) স্বত্ব অর্জন করা হয়েছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণের কাজ চলছে।


আম প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প

রাজশাহীতে আম প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে উঠেছে। আচার, জ্যাম, জেলি, জুস, আমসত্ত্ব, মিঠাই ও শুকনো আম তৈরি করে দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হচ্ছে। কাঁচা আম দিয়ে তৈরি আচার সারা বছর চাহিদা থাকে। পাকা আমের রস ও চিনি দিয়ে তৈরি আমসত্ত্ব শীতকালে চাহিদা বেশি থাকে। আমের জ্যাম ও জেলি ব্রেকফাস্ট ও শিশুদের জন্য জনপ্রিয়। স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের জন্য আমের জুস ও স্মুদির চাহিদা বাড়ছে।


চ্যালেঞ্জ ও করণীয়

রাজশাহীর আম চাষে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। কীটনাশকের অপব্যবহার ও ফলের গুণগত মান বজায় রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। প্যাকেজিং ও পরিবহনের সময় ফসলের অপচয় হচ্ছে। ভারত, পাকিস্তান ও থাইল্যান্ডের সাথে রপ্তানি বাজারে প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে। এছাড়া শ্রমিক সংকট ও মজুরি বৃদ্ধি সমস্যা তৈরি করছে।

এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিশেষজ্ঞরা জৈব পদ্ধতিতে আম চাষ ও কীটনাশকের ব্যবহার কমানোর পরামর্শ দিয়েছেন। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গুদাম ও প্যাকিং হাউস স্থাপন করতে হবে। আন্তর্জাতিক মানের প্যাকেজিং নিশ্চিত করতে হবে। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কৃষকদের দক্ষতা বাড়াতে হবে। রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণে কূটনৈতিক উদ্যোগ নিতে হবে।


ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

রাজশাহীর আম চাষের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা উজ্জ্বল। আগামী ৫ বছরে আম উৎপাদন দ্বিগুণ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়। জিআই স্বত্ব পাওয়ায় হিমসাগর আমের আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। আম প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে বিনিয়োগ বাড়ছে। রপ্তানি আয় বাড়াতে বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

কৃষি বিশেষজ্ঞ ড. মো. আব্দুল হান্নান বলেন, "রাজশাহীর আমের গুণগত মান বিশ্বের সেরা। সঠিক পরিকল্পনা ও বাজার ব্যবস্থাপনা করলে আগামী ১০ বছরে রাজশাহী বিশ্বের আমের রাজধানী হয়ে উঠতে পারে।"

জৈব সারের ব্যবহার বাড়ছে, রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমছে
লেখা

জৈব সারের ব্যবহার বাড়ছে, রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমছে

মো. ওয়াফি ৫ মাস আগে

কৃষি খাতে রাসায়নিক সারের অপব্যবহার পরিবেশ ও মাটির স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। তবে গত কয়েক বছরে জৈব সারের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। কৃষকরা এখন রাসায়নিক সারের পরিবর্তে জৈব সার ব্যবহারে আগ্রহী হচ্ছেন। জৈব সার মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করে এবং দীর্ঘমেয়াদে ফসলের উৎপাদন বাড়ায়।


জৈব সারের প্রকারভেদ

কৃষকরা প্রধানত তিন ধরনের জৈব সার ব্যবহার করছেন:

কম্পোস্ট সার: গোবর, খড়, পাতা ও আবর্জনা পচিয়ে তৈরি করা হয়। এটি মাটির গঠন উন্নত করে এবং পানি ধারণ ক্ষমতা বাড়ায়।

ভার্মি কম্পোস্ট: কেঁচো দিয়ে জৈব বস্তু পচিয়ে তৈরি করা হয়। এটি অত্যন্ত পুষ্টিকর ও সহজপাচ্য।

সবুজ সার: ধানের পর ঢেঁকি, ধইঞ্চা, শনপাট ইত্যাদি ফসল চাষ করে জমিতে পচিয়ে তৈরি করা হয়। এটি নাইট্রোজেনের অভাব পূরণ করে।


জৈব সারের উপকারিতা

জৈব সার ব্যবহারের বহুমুখী উপকারিতা রয়েছে। প্রথমত, এটি মাটির অম্লত্ব ও ক্ষারত্বের ভারসাম্য রক্ষা করে। দ্বিতীয়ত, জৈব সার মাটির অণুজীবের কার্যকলাপ বৃদ্ধি করে। তৃতীয়ত, রাসায়নিক সারের তুলনায় জৈব সার কম খরচে তৈরি করা যায়। চতুর্থত, জৈব সার দীর্ঘমেয়াদে মাটির স্বাস্থ্য উন্নত করে। পঞ্চমত, জৈব সার ব্যবহারে উৎপাদিত ফসল স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ।


কৃষকদের অভিজ্ঞতা

কুষ্টিয়ার কৃষক মো. আব্দুল হাই বলেন, "আমি তিন বছর ধরে জৈব সার ব্যবহার করছি। প্রথমে ফলন কিছুটা কম ছিল, কিন্তু এখন জমির উর্বরতা বেড়ে যাওয়ায় ফলন ভালো হচ্ছে। খরচও আগের চেয়ে কম হয়েছে।"


সরকারি উদ্যোগ

সরকার জৈব সার ব্যবহারে কৃষকদের উৎসাহিত করছে। জৈব সার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে ভর্তুকি ও প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। কৃষকদের জৈব সার তৈরির প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। জৈব পণ্যের জন্য আলাদা বাজার সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

কৃষি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জৈব সারের ব্যবহার আরও বাড়াতে হলে কৃষকদের সচেতনতা ও প্রশিক্ষণ জরুরি। দীর্ঘমেয়াদে টেকসই কৃষির জন্য জৈব সার অপরিহার্য।